সরকারের প্রথম বছর একটি পর্যালোচনা

দিনবদলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। অতিক্রান্ত বছরটি ছিল মহাজোট তথা আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। মাত্র এই এক বছরের কর্মকাণ্ড দিয়ে শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের সাফল্য ব্যর্থতার পরিমাপ করা দুরুহ এবং তা’ সঙ্গতও নয়। তবু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি এবং তার সরকারের প্রাথমিক সাফল্য সম্পর্কে সাধারণভাবে কিছু তথ্য এখানে উল্লেখ করছি।
* বিশ্ব অর্থনীতির ভয়াবহ মন্দা, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস এবং আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, চরম দারিদ্র্য, সুশাসনের অনুপস্থিতি এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি কারণে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছিলো। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে অর্থনীতিতে নেমে এসেছিলো স্থবিরতা। অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে কলঙ্কিত হয়েছিলো বাঙলাদেশ। এই পটভূমিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হয়।
* ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘‘দিনবদলের কর্মসূচি”র প্রতি দেশবাসী নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট প্রদান করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট জাতীয় সংসদের তিন চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করে। দেশবাসীর মনে সৃষ্টি হয় বিপুল প্রত্যাশা। এই জনপ্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার নিয়েই ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। স্বভাবতই সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকার মোতাবেক ৫টি অগ্রাধিকারের বিষয়ে মনোযোগ দেয়। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আসা, মন্দা মোকাবিলা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা মোকাবিলা, দারিদ্র্য নিরসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছিল বিদ্যমান সংকট উত্তরণে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।
একথা সত্য সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা অপরিসীম। কিন্তু এক বছরে তা পূর্ণ করা সম্ভব নয়। মাত্র এক বছরের কর্মকাণ্ড দিয়ে সরকারের সাফল্য ব্যর্থতার মূল্যায়ন করাও সঙ্গত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা আছে, ভুল-ত্রুটিও হতে পারে। তবে দিনবদলের যে অঙ্গীকার নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ-এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। বিরোধী বিএনপি-জামাত জোট বর্তমান সরকারের কল্পিত ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে যত চিৎকার, চেচামেচিই করুক না কেন জনগণ এতে বিভ্রান্ত হয়নি। আওয়ামী লীগের বড় সাফল্য তারা গত এক বছরে দেশে একটা সহিষ্ণু ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। বিএনপি-জামাত জোট চেষ্টা করেও জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামাতে পারেনি। একটি নির্বাচিত সরকারকে নানা ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাত মোকাবিলা করতে হলেও সরকার বিরোধী কোনো হরতাল বা বড় ধরনের গণ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কবলে পড়তে হয়নি। আসলে জনগণ যেমন অতীতের বিএনপি-জামাত জোট সরকারের দুঃশাসনের দুঃসহ স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেনি, তেমনি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও বড় ধরনের কোন অভিযোগ বা ক্ষোভও তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়নি।
তবে এতে আত্মপ্রসাদ লাভের কোনো সুযোগ নেই। মহাজোট সরকার তার প্রথম বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছে বটে, কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে আগামী বছরটিতে। মধুচিন্দ্রমা শেষ। এবার মানুষ নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশের প্রকৃত উন্নয়ন দেখতে চাইবে। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে অবিচল থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রকৃতই দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ এবং দিনবদল করতে সক্ষম হবে।