সন্ত্রাসী জোসেফ, রাস্তা সংস্কার ও বর্তমান ছাত্রলীগ

১৯৯৫ সাল, যখন সময়টা খুব বেশি খারাপ যাচ্ছিল। তখন বড়-শিশু সবার মনে ভয়ের জায়গা করে নিয়েছিল জোসেফ বাহিনী। মায়েরা সন্তানকে খাওয়াতেন জোসেফের ভয় দেখিয়ে। ঘুম পাড়াতেন জোসেফের ভয় দেখিয়ে। জোসেফ তখন সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার নামে দু’টো বাহিনীর নেতা। আমরা যখন বিকেলে মাঠে খেলতে যেতাম, তখন দেখতাম একদল সন্ত্রাসী অস্ত্র হাতে এলাকায় মহড়া দিচ্ছে। ত্রাস সৃষ্টি করছে। তখন অল্প টাকায় অস্ত্র ভাড়া পাওয়া যেত। নামমাত্র মূল্যে মানুষ খুন করানো যেত। জোসেফ বাহিনীর আবার বিভিন্ন উপদলও ছিল। দিনদিন তাদের কর্মকাণ্ড বাড়তে লাগল। থানায় অভিযোগ জমতে লাগল। মামলা জমতে লাগল। কিন্তু জোসেফকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। অথবা সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিল না। আইনের আওতায় নেওয়া যাচ্ছিল না। তার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল, জোসেফ রাজনীতি করত। ছাত্রলীগ করত। তার খুঁটিটাও ছিল বেশ শক্ত। বড় ভাই হারিস চৌধুরী ৪৪ নং ওয়ার্ডের তৎকালীন কমিশনার। হারিস ছিল তখন যুবলীগ নেতা। জোসেফ ছিল হারিসের সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান। কিলিং বাহিনীর প্রধান। ক্রমে, জোসেফ বাহিনী পুরো ঢাকার সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকল।

কিছুদিন পর সময় উল্টে গেল। তৎকালীন সরকার কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা করে। তালিকায় সন্ত্রাসী জোসেফকে ধরিয়ে দিতে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তার বছর খানেক পর জোসেফ নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার হয়। সেই থেকে সে কারাবন্দী। ১৯৯৬ সালের মে মাসে মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ হত্যা মামলার আসামি হয় জোসেফ। ২০০৪ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল মামলার অন্যতম আসামি জোসেফ ও মাসুদ জমাদারকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। হাইকোর্টের আদেশেও তার মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। আপিল বিভাগের রায়ে সে আদেশ বদলে যায়। মহামান্য আদালতের রায় অনুযায়ী, তার সম্ভাব্য কারামুক্তির তারিখ ২০৩৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। যদিও জোসেফের কারাজীবনের একটি দীর্ঘসময় কেটেছে হাসপাতালের প্রিজন সেলে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের খবর। সন্ত্রাসী জোসেফের সাজা মওকুফ করতে তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। কিন্তু কেন? একজন চিহ্নিত, সাজাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীর কাছে সরকারের কিসের দায়বদ্ধতা?
জানা গেছে, জোসেফের মা রেনুজা বেগম সন্তানের সাজা মওকুফের জন্য আবেদন করেছেন। এখন দ্রুত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন পাঠাতে বিশেষ তদবির চলছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে খুব শীঘ্র সাজা মওকুফের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি নাকি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
জাতীয় দৈনিকে সমসাময়িক সময়ে আরো একটি খবর। যে খবর আমাদের আনন্দ দেয়। রাজনীতি নিয়ে ভালো চিন্তা করতে শেখায়। রাস্তা সংস্কার করল ছাত্রলীগ। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ শহরের মহিলা কলেজের মোড়ে মূল সড়কে খানাখন্দ ও কাদাপানির কারণে প্রায় মাসখানেক ধরে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে এলাকাবাসী। বিষয়টি বহুবার এলজিইডি এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগকে (সওজ) জানানো হলেও সেটি সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ কারণে উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা স্বেচ্ছাশ্রমে ঐ সড়কে কাদাপানি কমাতে বালু ও খোয়া দিয়ে খানাখন্দ ভরাটে কাজ করে। কী অনন্য কর্মকাণ্ড আমাদের ছাত্রনেতাদের।
অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরো একটি খবর। বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িছে ছাত্রলীগ। ফেসবুকের পাতায় তার বড়বড় চিত্র। যখন আমাদের কেউ কেউ জানে এবং মানে, ছাত্রলীগ মানেই চাঁদাবাজি। ছাত্রলীগ মানেই নেশা। ছাত্রলীগ মানেই টেন্ডারবাজি। ছাত্রলীগ মানেই দলাদলি ও ভাগাভাগি। ছাত্রলীগ মানেই দু’গ্রুপের সংঘর্ষে প্রাণহানি। তখন দিনাজপুর ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড আমাদের স্বপ্ন দেখায়। আমরা আনন্দে বিভোর হই। তখন বন্যার্ত, অসহায় মানুষের পাশে ছাত্রলীগকে দেখে আমাদের চোখে জল চলে আসে। তখন আমরা সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সংগঠন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী সংগঠন। তারা দেশ গড়বে সেটাই স্বভাবিক। তারা সড়ক বিনির্মাণ করবে সেটিই প্রত্যাশিত। তারা স্বপ্ন দেখবে। স্বপ্ন দেখাবে। জাতিকে পথ দেখাবে। প্রচণ্ড অন্ধকারে আলো জ্বালবে। এটাই স্বাভাবিক। এটাই একান্ত চাওয়া। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দণ্ড মওকুফ করবেন এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও কেন যেন কিছু দণ্ড মওকুফ ব্যাপক অপ্রত্যাশিত। আমাদের চাওয়ার সাথে ব্যাপক ব্যবধান তৈরি করে। আমাদের ভাবায়, কাঁদায়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মাহমুদ হাসান আমার শ্রেণীকক্ষের ছাত্র। সদ্য এমবিএ শেষ করেছে। শ্রেণীকক্ষে মাহমুদ ভদ্র ও বিনয়ী। কখনো বিভাগীয় শিক্ষকের সাথে অশোভন আচরণ করেছে বলে মনে পড়ে না। কখনো বিভাগের পরিবেশ নষ্ট করেনি। কখনো শ্রেণীকক্ষের পরিবেশও নষ্ট করেনি। ওই একই ব্যাচের ছাত্র শাহীন। তার ঠিক পরের ব্যাচের ছাত্র পিয়াল। ওরা সবাই ছাত্রলীগের বড় বড় নেতা। ওরাও বেশ বিনয়ী। ওরা কখনো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চাওয়া নিয়ে অন্তত বিভাগকে বিরক্ত করেনি। কেন ভাবছি, মাহমুদ, শাহীন ও পিয়াল শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ নষ্ট করবে? ওরাতো ক’দিন পর দেশ গড়বে। দেশ চালাবে। মন্ত্রী হবে। এমপি হবে। ওদেরতো এখনই জ্ঞানতাপস হতে হবে। বিনয়ী হতে হবে।
অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বিধান আমাদের আইনে আছে। অপরাধীকে ক্ষমা করার বিধানও আমাদের সংবিধানে আছে। সামাজিক প্রয়োজনে, বৃহত্তর স্বার্থে সমাজে ন্যায়বিচারের কোনো বিকল্প নেই। আবার ঠিক একই প্রয়োজনে, কখনো কখনো অপরাধ ক্ষমাও বৃহৎ গুরুত্ব পেতে পারে। কিন্তু জোসেফের মত সন্ত্রাসীকে ক্ষমা করার আগে সরকারকে অবশ্যই ভাবতে হবে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি অবশ্যই অপরাধীকে ক্ষমা করার নেতিবাচক দিক বিবেচনা করবেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদের অভিভাবক। তিনি প্রজ্ঞাবান। তার সিদ্ধান্তে অবশ্যই সবদিক বিবেচিত হবে। সাধারণ বিবেচনায় জোসেফ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন। জোসেফের ক্ষমা মাহমুদ, শাহীন ও পিয়ালদের বিপদগামী করতে পারে। জোসেফের ক্ষমা দিনাজপুর ছাত্রলীগকে বিপথে উৎসাহিত করতে পারে। বিশ্বজিতের মত আরো হত্যাকাণ্ডকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। ছাত্র রাজনীতি বিপথে পরিচালিত হলে রাজনীতি পথ হারাবে। পথ হারাবে বাংলাদেশ। জোসেফের ক্ষমা কোনো অবস্থাতেই সরকারের কাছে বিবেচ্য হতে পারেনা। অন্যদিকে দিনাজপুর ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠুক।