বাংলাদেশ কোন পথে?

বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থার কথা চিন্তা করলে একজন ইংরেজ ঐতিহাসিকের উক্তি মনে পড়ছে। তিনি বলেছেন : The present is the child of the past and the parent of the future; অর্থাৎ বর্তমান হচ্ছে অতীতের সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতের স্রষ্টা। বাংলাদেশের বর্তমান সংকট ও দুরবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এর কারণসমূহ জানতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন পেছনের অর্থাৎ অতীত ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরানো।

এই অঞ্চলের মানুষ যাদের একটা বিরাট অংশ মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত তাদের চিন্তা-চেতনায় গত একশ’ বছরের মধ্যে যে অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী বিবর্তন ঘটেছে, সেটা অনুসন্ধান করা একান্ত প্রয়োজন। এই পরিবর্তনের ধারা ও স্বরূপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে এ সময়ের ঘটনাবলীর তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।

আঠার শতকের শেষের দিকে এই উপমহাদেশে ইংরেজ প্রতিষ্ঠার ফলে এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে আধুনিক পশ্চিমি সভ্যতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পশ্চিমি সভ্যতার প্রতি এই উপমহাদেশের দুই প্রধান সম্প্রদায়Ñহিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ভিন্নমুখী প্রতিক্রিয়ার ফলে উনিশ শতকে এই দুই সম্প্রদায়ের পরিবর্তন ও বিকাশ সমানভাবে হয়নি। পশ্চিমি সভ্যতার প্রতি হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া ছিল বাস্তবমুখী ও যুক্তিসঙ্গত। সুদীর্ঘ মুসলিম শাসনামলে হিন্দুরা সে সময়ের রাজ-ভাষা ফার্সি আয়ত্ত করে এবং মুসলমান শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতা করে শুধু নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি, উপরন্তু মুসলিম শাসকদের নিকট থেকে অনেক রকম সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি হিন্দুরা এ সময় মুসলিম শাসকদের রাজসভায় উচ্চ পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। মুসলিমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে তারা তাদের হিন্দুত্ব কিন্তু একটুকু বিসর্জন দেয়নি। অন্যদিকে মুসলিম শাসকরাও হিন্দু প্রজাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করেনি। পরবর্তীকালে ইংরেজ আমলেও হিন্দুরা ঠিক এই বাস্তবমুখী মনোভাব অবলম্বন করেছিল এবং ইংরেজি শিক্ষা অর্জন করে নিজেদের অবস্থার অভূতপূর্ব পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল।

অপর দিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া ছিল, সাধারণভাবে বলা যেতে পারে নেতিবাচক, যুক্তিহীন এবং অবাস্তব। তারা অতীতের স্বপ্নে বিভোর থেকেছে, অতীতের গৌরব ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টা করে বিভ্রান্ত হয়েছে। অতীতের পিছুটান এবং অতীত ঐতিহ্যের গুরুভার বহন করতে গিয়ে মুসলমান সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেনি। অন্যদিকে হিন্দু সমাজ ইতিহাসের ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ আবির্ভূত হয়েছিলেন তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে। এই সকল মনীষী কেবল হিন্দু সমাজের নেতা ছিলেন না; তারা ছিলেন আধুনিকতার জনক, সভ্যতার আলোকবর্তিকা। মুসলিম সমাজে এ ধরনের নেতার আবির্ভাব ঘটেনি। অন্যদিকে মুসলমানদের পরিবর্তন ব্যাহত হয়েছে নানাবিধ কারণে। একদিকে অতীতের পিছুটান, অন্যদিকে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার তাগিদ–এই দোটানা গোটা মুসলমান সমাজকে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ওয়াহাবী, ফরায়জী আন্দোলনের মত পশ্চাৎমুখী ও প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন মুসলমান সমাজের চরম ক্ষতিসাধন করেছিল। যুগ যুগ ধরে গ্রামবাংলায় যে সমন্বয়ধর্মী মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক লোকসংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। তার উপর বড় রকমের আঘাত হানতে শুরু করেছিল অর্ধশিক্ষিত কৃষক নেতা ও ধর্মান্ধ কুশিক্ষিত মোল্লা-মৌলভীদের দ্বারা পরিচালিত এইসব আন্দোলন। বর্তমান সময়ের জামায়াতে ইসলামী ও কতিপয় ইসলামী জঙ্গি সংগঠন যেমন ‘হরকাতউল জিহাদ’, ‘জামায়াতুল মুজাহিদ্দীন’, ‘লস্করি-ই-তাইয়াবা’ প্রমুখ উনিশ শতকের ওয়াহাবী ও ফরায়জী আন্দোলনের উত্তরসূরি বলা যেতে পারে।

এদিকে শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাংলার মুসলমান বেশি অগ্রসর হতে পারেনি। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে যখন নবাব আব্দুল লতীফ প্রমুখ মুসলমান নেতা অনেক দেরিতে হলেও ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের পক্ষে যে প্রচেষ্টা শুরু করেছিলেন, যদিও সে চেষ্টার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে সংঘবদ্ধ উদ্যোগ বা সুগভীর তাগাদা ছিল না। তাছাড়া আব্দুল লতীফের চিন্তাধারার মধ্যে অনেক স্ববিরোধিতা ছিল। আব্দুল লতীফ ইংরেজি শিক্ষার সমর্থক ছিলেন নেহাত জাগতিক প্রয়োজনে; তিনি মনে করতেন যে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করলে মুসলমানরা ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের আধুনিক যুক্তিনিষ্ঠ ও উদারনৈতিক ভাবধারা এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এদেশের মুসলমানদের প্রভাবিত করুক, এটা তিনি চাননি। আবার একদিকে আব্দুল লতীফ যেমন ইংরেজি শিক্ষার সমর্থক ছিলেন, অন্যদিকে তিনি প্রাচীন আমলের ধর্মভিত্তিক মাদ্রসা-শিক্ষা ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। আব্দুল লতীফের সমকালীন অন্য দুই মুসলমান নেতা যারা চিন্তা-চেতনায় ছিলেন অনেক প্রগতিশীল, যেমন সৈয়দ আমির আলী ও দেলোয়ার হোসেন আহমদ, তাঁরা কিন্তু মাদ্রাসাগুলি তুলে দিয়ে সেগুলির স্থানে ইংরেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা প্রবর্তন করার সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন মুসলমান সমাজে তাঁদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত সীমিত। তুলনামূলকভাবে আব্দুল লতীফের মত রক্ষণশীল নেতাদের প্রভাব সুমলমান সমাজে অনেক বেশি ছিল, বস্তুত আব্দুল লতীফের দাবি অনুযায়ী আমাদের দেশে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি পুরাতন যুগের ধর্মীও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা সমান্তরালভাবে চালু রাখা হয়, এই ব্যবস্থা এখনও বলবৎ আছে, এই দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ফলে মুসলিম মানস ভুবনে বৈপরীত্য ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে থাকে, যার প্রতিফলন দেখা যায় আমাদের সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তায়। আমাদের জাতীয় চেতনার মধ্যেও দুটি পরস্পর বিরোধী ধারা লক্ষ্য করা যায়। একটি আধুনিক সমন্বয়ধর্মী জাতীয়তাবাদের ধারা, যার ধারক হিসেবে ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ (Indian National Congress), অন্য ধারাটি ছিল পশ্চাৎমুখী ধর্মভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী মুসলমান জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ যার প্রতিভূ ছিল ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘নিখিল-ভারত মুসলিম লীগ’।

ভারতের মুসলমান সমাজের বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল নেতা, বদরুদ্দীন তৈয়বজী থেকে শুরু করে খান আব্দুল গফফার খান, মওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ মুসলমান নেতা ভাতীয় ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন। তাঁরা মনে করতেন যে, রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে সংমিশ্রিত করলে রাজনীতি ও ধর্ম উভয়ই কলুষিত হতে পারে। তাঁদের ধারণা ছিল যে একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের স্বার্থ ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকতে পারে। কিন্তু ধর্মান্ধতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ এই উপমহাদেশের অধিকাংশ মুসলমানের মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, তারা মুসলিম লীগের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলশ্রুতিতে জন্ম হয় পাকিস্তান নামক এক অদ্ভুত রাষ্ট্রের। যে ধারণার উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল সেটা এখন অলীক প্রমাণিত হয়েছে। বস্তুত, পাকিস্তান দাবির পেছনে একটি অনৈতিহাসিক ও ভিত্তিহীন ধারণা কাজ করেছিল। তা ছিল এই যে, ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরা যেহেতু এক ইসলাম ধর্মের অনুসারী, তাই তারা এক স্বতস্ত্র জাতি এবং এক অভিন্ন ‘তমাদ্দুন’ বা সংস্কৃতির ধারক। সুতরাং তাদের আশা-আকাক্সক্ষা এক স্বতস্ত্র ‘হোমল্যান্ড’ বা আবাসভূমি অর্থাৎ ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূরণ হতে পারে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই উপমহাদেশের বিশাল ভূখণ্ডে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসরত মুসলমানরা এক সমস্বত্ব সম্প্রদায় বা এক অভিন্ন জাতি হিসেবে কখনও গড়ে ওঠেনি। এই কথা বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভারতের গোটা মুসলমান জনসংখ্যার অর্ধেকের চেয়ে বেশি ছিল বাঙালি মুসলমান। ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার দিক দিয়ে তারা ছিল ভারতের অন্য অঞ্চলের মুসলমানদের চেয়ে একেবারে ভিন্ন। শুধু তাই নয়, ভাষা ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে তারা ছিল বাঙালি হিন্দুদের অনেক কাছাকাছি। বিবিধ কারণে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান দাবিকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই যখন পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকগোষ্ঠী ইসলাম ও পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির নামে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করল, তখন থেকেই বাঙালি মুসলমানদের পাকিস্তান সম্পর্কে মোহমুক্তি ঘটতে শুরু করল। যে বাঙালি মুসলমানরা একদিন নানাবিধ কারণে তাদের ধর্মীয় (ইসলামী) পরিচয়কে বেশি গরুত্ব দিত, এখন তারা তাদের নিজস্ব স্বতস্ত্র (বাঙালি) পরিচয় সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হতে শুরু করল। বাঙালি মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনকে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক বদরুদ্দিন উমর তাঁর অনবদ্য ভাষায় বলেছেন “বাঙালি মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন” বস্তুত ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি মুসলমান নিজের আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করল; তাদের মধ্যে দেশপ্রেম নতুনভাবে জাগ্রত হল। ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নেই তথা ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব-পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে মনীষী ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ্ এক অবিস্মরণীয় উক্তির মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল এক নয়া বাঙালি জাতীয় চেতনা। তিনি বলেছিলেন “আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি”। নিঃসন্দেহে এই চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, যা আমাদের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। উল্লেখ্য, বাংলার মুসলমান সমাজের দুই প্রধান নেতা আবুল কাশেম ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তান আন্দোলনের ঘোর সমর্থক ছিলেন এবং যাদের সমর্থন ছাড়া হয়তো পাকিস্তান সৃষ্টি হত না তাঁরাও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের সাম্প্রদায়িক নীতি সম্পর্কে একেবারে বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন; তাঁরা পাকিস্তানে এক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য আত্মনিয়োগ করেন। এইভাবে শুরু হয়ে যায় পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ এই বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক নতুন বাঙালি জাতীয় চেতনা জাগ্রত হয়েছিল। এই চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা। এই ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা প্রতিফলিত হতে শুরু করল আমাদের রাজনীতিতেও। মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ, আবার আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ এই চেতনারই বিবর্তনের ফল।

এই নতুন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতয়িতাবাদী চেতনার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষ তথা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী এক ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিতে পরিণত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল এই সংগ্রামেরই চূড়ান্ত পরিণতি। যার ফলাফল একটি নতুন রাষ্ট্র, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছুসংখ্যক লোক ছিল, যারা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে মেনে নিতে পারেনি। তারা ছিল মনে-প্রাণে পাকিস্তানী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পাক-হানাদার বাহিনীর সঙ্গে একত্রিত হয়ে বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগসহ নানাবিধ মানবতাবিরোধী ও জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।

অন্যদিকে পাকিস্তান একাত্তরের ন্যক্কারজনক পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যে কোন উপায়ে মুজিব সরকারকে উৎখাত করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া অথবা বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী সরকার গঠন করার চক্রান্ত শুরু করেছিল। এই দেশী ও বিদেশী চক্রান্তের ফলেই সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কাপুরুষোচিত, কলঙ্কময় এবং বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম জঘন্য সামরিক অভ্যুথান। যার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানী আদলে পুনর্গঠন করে, বাংলাদেশকে আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সুযোগ পেল। বলা যেতে পারে দুই দশকের মধ্যেই তাদের সে চেষ্টা অনেকখানি সফল হয়েছিল। দুই সমরনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এইচএম এরশাদ এবং পরে জিয়ার স্ত্রী, বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে, বলা যেতে পারে নেহাত জেদের বশে বাংলাদেশকে ইসলামীকরণ ও পাকিস্তানীকরণের প্রক্রিয়া এমনভাবে করা হয়েছে, যা বাংলাদেশকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নিতান্ত হাস্যস্পদে পরিণত করেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে। কিন্তু বাংলাদেশকে ইসলামীকরণ ও পাকিস্তানীকরণের প্রভাব এমনভাবে জেঁকে বসেছিল যে, এই অশুভ প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত করে এদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তা সম্ভবত এই কারণে যে, ১৯৭২ এই ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে ফিরিয়ে আনতে, সংবিধান পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসন সংখ্যা তখন আওয়ামী লীগ সরকারের ছিল না। তবে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বেশকিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল যেমন (ক) ভারতের সাথে দীর্ঘমেয়াদি গঙ্গা (পদ্মা) নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর; (খ) পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পাদন করে শান্তি বাহিনীর বিদ্রোহের অবসান; (গ) বাংলাদেশের মানুষের উপর চেপে থাকা কালো আইন ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন এবং জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড তথা জেল হত্যার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা; (ঘ) সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, অশিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রশংসনীয় সৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের এই সাফল্য মনে হয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ বিরোধী পক্ষের লোকদের ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। তারা নানাভাবে আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়।

অহেতুক কারণে জাতীয় সংসদ বর্জন করতে লাগল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে কুৎসা ছড়াতে লাগল। এই পরিস্থিতিকে আওয়ামী লীগ দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে পারেনি। তাদের উচিত ছিল ব্যাপক উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে দল ও সরকারের অবস্থানকে সুসংহত করার চেষ্টা করা। সেটা না করে অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী পক্ষের প্রতি আপোষমূলক নীতি অনুসরণ করতে লাগল যার পরিণতি হয়েছিল মারাত্মক। কথাটা আর একটু খোলাসা করে বলি। স্মর্তব্য যে, ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে আদর্শগতভাবে পাকিস্তানের কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য জোরেশোরে ইসলামীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেন। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মুছে ফেলা হয়। সংবিধানে বিসমিল্লাহির রহমানের রাহিম সংযোজন করা হয়। ‘বিসমিল্লাহ্’ দিয়ে বক্তৃতা শুরু করা এবং যে কোন অনুষ্ঠান বা সভা কোরআন তেলাওয়াত দিয়ে আরম্ভ করার রেওয়াজ চালু করা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৭৫-এর আগে কোন মুসলিম রাজনৈতিক নেতা যেমন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান এমনকি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করতেন না এবং কোন রাজনৈতিক সভা ও কার্যক্রমে কোরআন তেলাওয়াত করা হত না। বাংলাদেশের সামরিক শাসকরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র বদলে দিয়ে এদেশকে দ্বিতীয় পাকিস্তানে রূপান্তরিত করার চক্রান্তে লিপ্ত হল। এইভাবে ইসলামকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে জনগণের মনে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়িয়ে দিয়ে, ভারত-বিদ্ধেষী মনোভাব জাগ্রত করে বাঙালির জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে কার্যত বাংলাদেশকে পাকিস্তাননির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এছাড়া আওয়ামী লীগ যাতে আর কখনও ক্ষমতায় আসতে না পারে সে জন্য ব্যাঙের ছাতার মত শতাধিক ক্ষুদে রাজনৈতিক দল গঠন করাকে উৎসাহিত করা হল নানাভাবে।

জিয়ার পর অন্য এক সমরনায়ক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে ইসলামীকরণের প্রক্রিয়াকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন। তিনি ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করলেন। রবিবারের জায়গায় শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা করা হল। বস্তুত ইসলামীকরণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ খোদ পাকিস্তানকেও ছাড়িয়ে গেল। এইভাবে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সেনাশাসক ও তাদের অনুসারীরা দেশের জনগণের মধ্যে ইসলামের নামে প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাৎমুখী ধ্যান-ধারণা এমন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ইসলামীকরণ ও পাকিস্তানীকরণের প্রক্রিয়াকে রোধ করতে পারেনি, বরং বোধ হয় নেহাত কৌশলগত কারণে মেনে নিয়েছিল। বিরোধী পক্ষের সমালোচনাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতারা বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপি-জামায়াত নেতাদের মত বিসমিল্লাহ দিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি শুরু করতে লাগলেন। আওয়ামী লীগের পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট প্রভৃতিতে ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান’ লেখা হতে লাগল এবং দলীয় সভা-সমাবেশের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করা রীতি প্রচলন করা হল। কিন্তু এইসব Gesture-এ আওয়ামী লীগের কোন লাভ তো হলই না; বরং মারাত্মক বলে প্রমাণিত হল। প্রথমত বিএনপি ও ইসলাম পছন্দ দলগুলোকে যতই ছাড় দেওয়া হোক, তাদের প্রতি যতই আপোষমূলক আচরণ করা হোক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের শত্রুতা এতটুকু কমবে না; বরং আওয়ামী লীগের এই ধরনের Gesture বা মিত্রসুলভ আচরণকে তারা দুর্বলতা বলেই ধরে নিয়েছিল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বোঝা উচিত ছিল যে, যারা ইসলাম নিয়ে ব্যবসা করছিল, যারা ছিল ধর্মান্ধ বিকৃতমনা-মৌলবাদী, তাদের সঙ্গে ইসলামীকরণের এই প্রতিযোগিতায় তাঁরা কখনই জিততে পারবে না।

পরবর্তী ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয় এটাই প্রমাণ করল যে, অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত জনগণের অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার ও ধর্মীয় অনুভূতিকে মূলধন করে ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার নীতিহীন রাজনীতি কখনই সুফল বয়ে আনতে পারে না, শেষ রক্ষা করতে পারে না। ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে ক্ষমতায় থাকাকালীন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এই সকল অপশক্তিকে দৃঢ়ভাবে দমন করে, সমাজ থেকে সকল প্রকার দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূল করে দেশে প্রকৃত অর্থে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং তাদের নিজেদের চরিত্র, আচরণ, সততা ও যোগ্যতা সম্পর্কে দেশের সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে যদি সক্ষম হতেন, তাহলে ২০০১ সালের নির্বাচনে তাদের ওরকম লজ্জাজনক ও অবিশ্বাস্য পরাজয় বরণ করতে হত না। নিজের ব্যর্থতা ও অক্ষমতার জন্য অন্যদের উপর দোষ চাপিয়ে লাভ হয় না। আওয়ামী লীগের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এবং নানারকম ছলচাতুরী দ্বারা জনগণকে বিভ্রান্ত করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও জামায়াত, তথা চারদলীয় জোট ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে সরকার গঠন করল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই জোট সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র, সীমাহীন দুর্নীতি ও চরম দুঃশাসনের ফলে দেশের জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। সরকারের ভ্রান্ত নীতি ও কর্মকাণ্ডের ফলে বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল। জোট সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত করে বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী যে কুৎসিৎ কাণ্ড-কারখানায় লিপ্ত হল, তার ফলে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত সেই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি এবং দেশ এক চরম বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল।

এখানে এক দশক বা তার কিছু বেশি সময় আগে থেকে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে যে অভূতপূর্ব চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটেছিলো সে সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যেতে পারে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৭৫-এর অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সামরিক বাহিনী দখল করে নেয়। নিজেদের অবৈধ ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করে রাখার জন্য তারা জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। গোটা দেশ ও সমাজকে ইসলামীকরণ ও পাকিস্তানীকরণ প্রক্রিয়া পুরোপুরিভাবে করা হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের সামরিক শাসকরা চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থন নিয়ে কট্টর ভারত-বিরোধী নীতি অনুসরণ করতে লাগল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এবং বিশেষ করে ইসলামী জঙ্গিবাদের হুমকির প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এক বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। যেহেতু পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বলা যেতে পারে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণে ইসলামী প্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীসমূহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, এর ফলে বিশ্ব সম্প্রদায় বিশেষ করে উন্নত দেশগুলি থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মত হয়েছিল। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর পক্ষে মোটেই সুখকর ছিল না। কারণ সেনাবাহিনী বিদেশী অর্থ সাহায্যের উপর অনেকখানি নির্ভরশীল ছিল। বিশ্ব পরিস্থিতির এই বিরাট পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপরও পড়েছিল। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক সৈন্য নিযুক্ত হওয়ায় সেনাবাহিনী আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হয়েছিল, কিন্তু বিশ্বব্যাপী ইসলামী জঙ্গিবাদের হুমকির ফলে এবং বিশেষ করে ধর্মান্ধ জঙ্গিদের দ্বারা ২০০০ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বিশ্ব-বাণিজ্য কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও অন্য মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ যেখানে ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্যরা পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল, সেসব দেশের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলির সম্পর্কেরও চরম অবনতি ঘটতে শুরু করে, যার প্রভাব বাংলাদেশের উপরও পড়ে। আমরা দেখেছি বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে ইসলামী জঙ্গিবাদ কীভাবে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নতুন প্রজন্মের অফিসার ও অন্য সদস্যরা একথা ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল যে জাতিসংঘ ও বিশ্বের প্রভাবশালী জনমত কোন দেশে সেনাশাসন পছন্দ করে না; তারা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে সমর্থন করে এবং তারা রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশের ঘোর বিরোধী। সুতরাং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেকেই যারা উচ্চ শিক্ষিত এবং উদারমনা এবং আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থার সমর্থক তারা বিএনপি-জামায়াতের প্রতিক্রিয়াশীল, ধর্মভিত্তিক এবং নোংরা রাজনীতির থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করতে লাগল। বলা যেতে পারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মইন উ আহমদ ছিলেন এই নতুন প্রজন্মের সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিনিধি। আমরা দেখেছি কীভাবে দেশের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে জেনারেল মইন উ-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে একজন সম্পূর্ণ নির্দলীয় ব্যক্তি এবং বিশিষ্ট ভদ্রলোক ড. ফখরুদ্দিন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

এখন এই নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্ধারিত তিন মাস সময় অতিক্রম করার পরও দুই বছর ক্ষমতায় থেকেছে। এর পেছনে একটা মাত্র ব্যাখ্যা ছিল সেটাকে বলা যেতে পারে doctrine of necessity অর্থাৎ নেহাত প্রয়োজনের তাগিদে। ফখরুদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই দু’বছরে বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। প্রথমবারের মত দেশের সকল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ছবিসহ পরিচয়পত্র তৈরি করেছে। সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছে এবং পরিশেষে অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে, উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। নিঃসন্দেহে এদেশের ক্ষেত্রে এসব বিরাট ঐতিহাসিক সাফল্য। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতা ও সাহায্য ছাড়া এ বিশাল কর্মকাণ্ড সুসম্পন্ন করা সম্ভব হত না। তবে সেই সঙ্গে সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দিন সরকার এমন কিছু কাজ করেছিল যেগুলিকে বলা চলে হঠকারিতামূলক, অর্বাচীন ও অসমর্থনযোগ্য। হঠাৎ করে অত্যধিক ক্ষমতা পেলে কিছু মানুষ সবজান্তা হয়ে যায় এবং ক্ষমতার অন্ধত্বে আক্রান্ত হয়ে মাত্রাজ্ঞান ও সুবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন কোন পদক্ষেপে সে রকমই পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন তথাকথিত minus two formula অনুসরণ করতে গিয়ে দেশের দুই শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে কতকগুলি দুর্বল ও বানোয়াট অভিযোগে গ্রেপ্তার করে বিশেষ কারাগার তৈরি করে সেখানে প্রায় এক বছর আটকিয়ে রাখা; তাছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করে জেলে প্রেরণ এবং পরে বিচার করে অনেককে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড প্রদান করার প্রক্রিয়াটাও ছিল অত্যন্ত হঠকারিতামূলক। কিছুদিন পর দেখা গেল যে দুর্বল বিচার ব্যবস্থায় এবং আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে তারা প্রায় সবাই খালাস পেয়ে গেছেন। আজ তারা এক একজন বিজয়ীর বেশে বেরিয়ে এসে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বলছেন এসব ছিল তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র যা আদালতে মিথ্যা প্রমাণিতই হয়েছে; আসলে তারা ফুলের মত নিষ্পাপ। অথচ দুর্নীতি দমন কমিশন যে কাজটি করতে পারত সেটা হল যাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ ছিল তাদের গ্রেপ্তার না করে সকল অভিযোগের তথ্য-প্রমাণসহ একটি শ্বেতপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়া। এর ফল হত অভূতপূর্ব।

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দুই দলের যেসব নেতা আজ জনসমক্ষে গলাবাজি করছেন সেটা অন্তত বন্ধ হত এবং অবলীলায় জনসাধারণের মধ্যে আসতেও তাদের একবার ভাবতে হত।

যাই হোক, সব ভাল যার শেষ ভাল। দেশে এই প্রথম এতবড় একটি জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত স্বচ্ছ, সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হল। এটা সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরাট সাফল্য। এর জন্য গোটা জাতি তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি ও জনাব রাশেদ খান মেননের বামপন্থী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ নতুন মহাজোট সরকারের সার্বিক মূল্যায়ন করার সময় এখনও আসেনি। তবে আমার মনে হয়েছে যে শেখ হাসিনার সামনে এবার অগ্নিপরীক্ষা এবং তিনি তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে সতর্কতার সঙ্গে তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার চেষ্টা করছেন। তরুণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মত আওয়ামী লীগ ও মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা দেশের মানুষকে দিন বদলের স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। কাজটা বড়ই কঠিন। মন না রাঙ্গিয়ে শুধু বসন রাঙ্গালে যেমন যোগী হওয়া যায় না, তেমনি নিজেকে না বদলালে অন্য কিছুকেও বদলানো যায় না। আত্মসমালোচনা, আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মশুদ্ধি ছাড়া আত্মশক্তি অর্জন করা যায় না। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সকল নেতা-নেত্রী ও সকল স্তরের কর্মীদের একথা উপলব্ধি করতে হবে। রোজ যখন খবরের কাগজে দেখি যে, কোনভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এবং এর ফলে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে; ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নামে দুষ্কৃতকারীরা তাদের দুষ্কর্ম অর্থাৎ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি প্রভৃতি, বলা যায় নির্বিঘেœ চালিয়ে যাচ্ছে; ছিনতাই, খুন-খারাপি বন্ধ করা যাচ্ছে না তখন শংকিত না হয়ে পারি না। এইসব ব্যাপারে সরকারকে আরও সজাগ হতে হবে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিরপেক্ষ ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকার যে সত্যি নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে বা করতে পারে এবং তার কাজের মধ্যে যথেষ্ট স্বচ্ছতা রয়েছে–সাধারণ জনগণের মনে এই বিশ্বাস আনতে হবে।

এখানে একটা বড় প্রশাসনিক সমস্যা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সত্যিকার অর্থে বিকেন্দ্রীকরণ না করলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের দেশে সংসদীয় ব্যবস্থার নামে যে অদ্ভুত ব্যবস্থা চালু আছে, তাকে সংসদীয় গণতন্ত্র না বলে প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতন্ত্র বলা যায়। কারণ রাষ্ট্রীয় সব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দপ্তর এবং অনেক সময় কিছু স্বার্থান্বেষী অশুভ চক্র এই দপ্তরের আশপাশে ঘুরে বেড়ায় এবং এই দপ্তরের কাজকর্মকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এর ফলে মন্ত্রিসভার সদস্যগণ স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, পার্লামেন্ট্রী বা সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়েছিল আঠার শতকের প্রথম দিকে ব্রিটেনে এক বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হল এটা কোন লিখিত শাসনতন্ত্র নয়। কালের প্রবাহে সময়ের প্রয়োজনে কতকগুলি অলিখিত নিয়ম বা প্রথার সমষ্টি নিয়ে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র নির্মিত হয়েছে। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের যৌথ নেতৃত্বের উপর ভিত্তি করে সকল সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয় first among equals অর্থাৎ তিনি শুধুমাত্র অন্য সকল মন্ত্রীর মধ্যে প্রথম বলে বিবেচিত হন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহকর্মী অন্য মন্ত্রীদের কাজে-কর্মে হস্তক্ষেপ করেন না; মন্ত্রীরা স্বাধীনভাবে নিজ নিজ দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু তাদের কাজকর্ম সমন্বয় করেন মাত্র। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে কিন্তু এই ব্যবস্থা মোটামুটি ভালভাবেই চলছে।

এখানে আর একটা বিষয় বলতে চাই, যেটা আমি আগে একাধিকবার বলেছি। আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে এবং দলীয় নীতি-আদর্শ ও কর্মসূচি অনুযায়ী সরকার পরিচালিত হয়। দলের যিনি সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক অর্থাৎ নির্বাহী কর্মকর্তা তারা পার্লামেন্টের সদস্য হলেও সাধারণত মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন না। তাদেরকে সরকারের watch dog-এর ভূমিকা পালন করতে হয়। তারা সরকার ও জনসাধারণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। দলের প্রধান নেতারা যদি মন্ত্রী হয়ে বসেন, তাহলে দলের সাংগঠনিক কাজে তারা যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না, ফলে দল দুর্বল হয়ে যায়। পার্টটাইম নেতাদের দিয়ে তো দলের কাজ সুষ্ঠুভাবে চালানো সম্ভব নয়। দল যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সরকারও দুর্বল হয়ে যায় এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। আমার মনে পড়ে ১৯৫৬ সালে তখন শেখ মুজিবুর রহমান তরুণ নেতা, তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন পার্টিকে শক্তিশালীভাবে গঠন করার জন্য।

আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই। বর্তমানে তরুণ সমাজে বিশেষ করে ছাত্র ও বেকার যুবকদের মধ্যে যে প্রচণ্ড অস্থিরতা ও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তাদের নানাবিধ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও অপরাধমূলক কর্মে সম্পৃক্ততার মধ্যে। এর প্রধান কারণ বোধহয় আমরা তাদের সামনে কোন আদর্শ তুলে ধরতে পারিছি না; তাদের কোন সৃজনশীল ও গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত করতে পারছি না। একটা সুপরিকল্পিত কর্মসূচি প্রণয়ন করে এইসব তরুণকে দেশের সার্বিক উন্নয়নের কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গ্রামাঞ্চলে নিয়োজিত করা যেতে পারে। একটি স্বতন্ত্র যুব ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। যেসব ছাত্রছাত্রী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর প্রায় তিন-চার মাস বসে থাকে, এসব কর্মহীন বেকার যুবককে নিয়ে একটি জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে তাদেরকে একটা সমন্বিত গ্রাম-উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা যায়। আমার মনে হয় এ ধরনের প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সাহায্য পেতে অসুবিধা হবে না।

এবার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে কিছু বলতে চাই, সেটি হল আমাদের পররাষ্ট্রনীতি। বর্তমান পৃথিবীর যে কোন দেশের পররাষ্ট্রনীতি সেদেশের সার্বিক স্বার্থে পরিচালিত হয়। কূটনৈতিক ভাষায় এটাকে বলা হয় enlightened self-interest। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালে অতি স্বল্পকালীন সময় যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। সে সময় পাকিস্তান ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু; কিন্তু তা সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দী মনে করেছিলেন যে, পাকিস্তানের তার নিজের, বিশেষ করে ভৌগোলিক-রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গেও বন্ধুত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। বলা যেতে পারে পাকিস্তান এই নীতি অনুসরণ করে অনেক দিক দিয়ে লাভবান হয়েছিল। এই নয়া নীতির সমর্থনে সোহরাওয়ার্দী যে উক্তি করেছিলেন সেটা ছিল তাঁর ভাষায় friendship towards all and malice towards none। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর এই উক্তির প্রতিধ্বনি করে ঘোষণা করেছিলেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হবে “সকলের সঙ্গে সৌহার্দ্য, কারোর প্রতি বৈরিতা নয়”। বস্তুত শেখ মুজিব বাংলাদেশের সঙ্গে তার নিকট-প্রতিবেশী দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও সম্পর্ক গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম ভারত সফরকালে কোলকাতায় ১৯৭২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি এই আশা ব্যক্ত করেছিলেন যে, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোন প্রস্তাবের প্রতি বাংলাদেশ ইতিবাচক সাড়া দেবে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন : “Let us bring to an end once and for all the sterile policy of confrontation between neighbours. Let us not fritter away our national resources but use them to lift the standard of living of our people.” অর্থাৎ আসুন আমরা চিরদিনের জন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে সংঘাতমূলক ও বিরোধের নীতির অবসান ঘটাই। আমাদের জাতীয় সম্পদের অপচয় না ঘটিয়ে সেগুলি আমাদের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করি”। কিন্তু এ বিষয়ে কোন বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু পাননি। যারা তাঁকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হত্যা করে তারা এই নীতিকে পুরোপুরি অস্বীকার করল। যদিও এর দশ বছর পর ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে SAARC-এর জন্ম হয়েছিল, এটি ছিল আসলে বঙ্গবন্ধুরই স্বপ্নের বাস্তবায়ন। কিন্তু SAARC কখনই ASEAN-এর মত একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি প্রধানত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকারের অদূরদর্শী নীতির জন্য।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দেশটিকে বলা যেতে পারে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের মধ্যে সেতুবন্ধন। যদিও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী, বেশ কিছুসংখ্যক অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষ যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান এবং বিভিন্ন আদিবাসী এদেশে পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে শান্তিতে বাস করে আসছে। বস্তুত বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান ও পশ্চিম এশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের মুসলমানদের চেয়ে ধর্মীয় আচরণ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার দিক দিয়ে একেবারে ভিন্ন। তারা এইসব অঞ্চলের মুসলমানদের মত ধর্মান্ধ এবং সাম্প্রদায়িক নয়। বাঙালি মুসলমানরা অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি সহনশীল মনোভাব পোষণ করে। ধর্ম-কর্ম পালনের ক্ষেত্রেও তারা রক্ষণশীল নয়। বস্তুত বাঙালি মুসলমানদের ধর্ম ও সমাজ-চিন্তায় পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের উগ্র রক্ষণশীল ও মৌলবাদী মোল্লা-মৌলভীদের সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক প্রচারণার চেয়ে আধ্যাত্মিক মানবতাবাদী উদারমনা সুফি-সাধক পীর-দরবেশ ও ফকির-আউলিয়াদের প্রভাব অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়। বলা যেতে পারে যুগ যুগ ধরে বাংলার মুসলমানরা ইসলাম ধর্মের অন্তর্নিহিত বাণীর প্রতি আকৃষ্ট রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে বাঙালি মুসলমানরা অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের চেয়ে বাঙালি হিন্দুদের অনেক কাছাকাছি। বাঙালির এই অসাম্প্রদায়িক সমন্বয়ধর্মী সংস্কৃতির জন্য বাংলাদেশ তার নিকটতম প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের সার্বিক উন্নতি সাধন করতে পারে।

বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন। একথা কখনই ভোলা যায় না যে, ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত সরকার এবং ভারতের প্রায় সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ নয় মাসের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হত না। তাছাড়া ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে; উভয় দেশ এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। উভয় দেশ তাদের জাতীয় সঙ্গীত নিয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে। তাছাড়া ভৌগোলিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের তিন দিক উত্তর, পশ্চিম, পূর্ব-ভারত ভূমির দ্বারা বেষ্টিত। এমনকি দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর বলা যেতে পারে ভারতের নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাছাড়া ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ হলেও কোটি কোটি মুসলমান সেদেশের নাগরিক এবং তারা সমান অধিকার নিয়ে সেখানে বসবাস করছে। স্বাধীনতার পর ভারতের তিনজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন মুসলমান।

বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনন্য বৈশিষ্ট্য হল শাসক দল কংগ্রেসের সভানেত্রী একজন ইতালীয় এবং খ্রীষ্টান বংশোদ্ভূত মহিলা; রাষ্ট্রপতি একজন হিন্দু মহিলা; উপরাষ্ট্রপতি একজন মুসলমান এবং প্রধানমন্ত্রী একজন শিখ। এই কারণে ভারত-বিদ্বেষী বা হিন্দু-বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশ কখনই শান্তিতে বাস করতে পারবে না। অবশ্যই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে এতটুকু ক্ষুন্ন না করে। বাংলাদেশের নিকট-পূর্বাঞ্চলে বৌদ্ধপ্রধান মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড অবস্থিত। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের মত মুসলিমপ্রধান হলেও এইসব দেশের অধিবাসীরা বাঙালি মুসলমানদের মত ভিন্নধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীল এবং যুগ যুগ ধরে এই দেশসমূহে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছে। উল্লেখ্য, জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃত। সুতরাং বর্তমান একুশ শতকের বিভিন্নমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে বাংলাদেশকে মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র হিসেবে নয়; বরং প্রকৃত অর্থে একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রজ্ঞা, সততা, দূরদর্শিতা এবং উদার বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে যদি এইসব গুণ প্রতিফলিত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের নিরাশ হওয়ার কারণ নেই।