বন্ধুহীন আওয়ামী লীগ

নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতা ছাড়া নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে দেশ অচল করার হুমকি দিয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশ অচল করার লক্ষ্যে প্রথমে ৪৮ ঘণ্টা, পরে আরও ২৩ ঘণ্টা বাড়িয়ে রাজপথ-রেলপথ-নৌপথ অবরোধের ডাক দেয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। অর্থাৎ ২৬ নভেম্বর মঙ্গলবার ভোর ছয়টা থেকে ২৯ নভেম্বর শুক্রবার ভোর ৫টা পর্যন্ত টানা ৭১ ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে ১৮ দলীয় জোট।

৭১ ঘণ্টার অবরোধ চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। প্রথম দু’দিনেই কমপক্ষে ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। অবরোধের সময় রেল চলাচল বাধাগ্রস্ত করার জন্যে বেশ কয়েকটি স্থানে রেলের ফিস প্লেট, স্লিপার তুলে ফেলা হয়েছে। রেল লাইনে এবং বগিতে আগুন ধরানোর ঘটনাও ঘটেছে। কয়েক স্থানে রেলের বগি লাইনচ্যুত হয়ে অসংখ্য যাত্রী যেমন আহত হয়েছেন, তেমনি রেল যোগাযোগও বিপর্যস্ত হয়েছে।

অবরোধের সময় ঢাকা শহরে যানবাহনের চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও ঢাকার বাইরে তা ছিল না। দূরপাল্লার গাড়ি চলেনি। অসংখ্য বাস-ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণহানির ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি অনেকেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছেন।

লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী পড়েছে চরম বিপাকে। নির্ধারিত সময় পরীক্ষা দিতে না পেরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছে।

বিরোধী দলের এই রাজনৈতিক কর্মসূচি সরকারকে কতটুকু চাপের মধ্যে ফেলতে পেরেছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবন যে দুঃসহ করে তুলতে পেরেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শোনা যাচ্ছে, আগামী সপ্তাহ থেকে আবারও টানা হরতাল বা অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণার পরিকল্পনা বিরোধী দলের রয়েছে।

বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলায় সরকার কঠোর মনোভাবের পরিচয় দেবে বলে বলা হলেও বাস্তবে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এক একটি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় আর মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয় নতুন নতুন নাম, বাড়ে নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা। এই অবস্থা চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় কাটছে সবার।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের শুভবুদ্ধির উদয় হবে, তারা সংঘাত-সংঘর্ষের পথ পরিহার করে সংলাপ ও সমঝোতার পথে আসবেন– এই প্রত্যাশা বিভিন্ন মহল থেকেই ব্যক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং দলের প্রভাবশালী আরও কয়েকজন নেতা একাধিকবার বলেছেন যে, সংলাপ বা সমঝোতা হোক বা না হোক, দলের নেতাকর্মীদের চাপেই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। আওয়ামী লীগ নেতাদের এ ধরনের বক্তব্যে কারও কারও মনে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। সৈয়দ আশরাফ ও মির্জা ফখরুল মিলে গোপন বৈঠকের খবরেও আশা জেগেছিল অনেকের মনে। গোপন যোগাযোগ ও সমঝোতা প্রয়াস এখনও চলছে বলে শোনা যাচ্ছে।

তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর অনেকেরই মনে হচ্ছে, আশা মরীচিকার পিছে ছুটে লাভ নেই। নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা সম্ভবত আর নেই। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি। আবার আওয়ামী লীগও এই প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি আছে বলে মনে হয় না।

নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করে এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা যাবে বলে বাজারে কিছু কথা চালু থাকলেও এবং নেপথ্যে বিভিন্ন মহলের নানামুখী তৎপরতার খবর শোনা গেলেও, বাস্তবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে এ ধরনের কোনো আভাস-ইঙ্গিত দলটির কোনো পর্যায়ের কোনো নেতার কাছ থেকেই পাওয়া যাচ্ছে না।

বরং এটাই বেশি শোনা যাচ্ছে যে, জামায়াতের কৌশলের ফাঁদে আটকা পড়েছে বিএনপি। সেজন্যই বিএনপি সমঝোতার পথ থেকে দূরে থাকছে। জামায়াতের কৌশল হল সমঝোতার পথ থেকে বিএনপিকে বিরত রেখে আন্দোলনের পথে তাদের ঠেলে দেওয়া এবং আন্দোলনের নামে দেশে নৈরাজ্যের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ ভণ্ডুল বা ব্যাহত হয়।

দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত এবং আদালতের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াতের এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে যে কোনো উপায়ে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং নির্বাচন যাতে যথাসময়ে না হয় সে পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। আটক ও দণ্ডিত নেতাদের মুক্ত করা ছাড়া আর কোনো বিষয়ই জামায়াতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আর জামায়াত যেহেতু দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না, সেহেতু নির্বাচনের ব্যাপারেও তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাই জামায়াত চাইছে সন্ত্রাস-সহিংসতার মাধ্যমে দেশের মধ্যে একটি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে। বিএনপিও জামায়াতের এই রাজনৈতিক পরিকল্পনার ফাঁদেই নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করছেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক।

বিএনপির মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া না-নেওয়ার প্রশ্নে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা টানাপড়েন আছে। বিএনপির কেউ কেউ মনে করেন নির্দলীয় সরকারে দাবি পূরণ না হলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত। পাঁচ সিটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে যাওয়ায় মনে করা হয় বিএনপির জনপ্রিয়তা বা জনসমর্থন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে এবং নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের বিজয় ঠেকানো যাবে না।

নির্বাচনে অংশ নিলেই যেখানে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ হাতের মুঠোয় আসবে, সেখানে নির্বাচন থেকে বাইরে থাকার কোনো যুক্তি বিএনপির অনেকেই খুঁজে পান না। আবার কারও কারও ধারণা এটাই যে সরকার কোনোভাবেই বিএনপিকে নির্বাচনে জিততে দেবে না। নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য পূরণ করা ছাড়া বিএনপির কোনো লাভ হবে না। তাই নির্দলীয় সরকারের দাবি না মানলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে তাদের প্রবল আপত্তি।

বিএনপির মধ্যে আরও একটি চিন্তা কাজ করছে বলে শোনা যায়। আর সেটা হলও জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধদের বিচার ইস্যু। নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি যদি জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করা তাদের জন্য বিব্রতকর হতে পারে।

বিএনপি এখন কার্যত একটি জামায়াতনির্ভর দলে পরিণত হলেও, বিএনপিতে জামায়াতবিরোধী শক্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে বলে মনে করা ঠিক হবে না। তবে ১৮ দলের নামে আন্দোলনের যেসব কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে তা মূলত জামায়াতের পরামর্শ অথবা তাদের সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সংঘাত-সংঘর্ষ হচ্ছে তাতেও বিএনপির নেতাকর্মীদের চেয়ে জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি কর্মীদের অংশগ্রহণই বেশি লক্ষ্য করা যায়।

বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও বিএনপির সিনিয়র নেতারা আন্দোলনের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেন না। নেতাদের রাজপথে না দেখে কর্মীরাও ঘর থেকে বের হতে চায় না। অথচ গ্রেপ্তার-নির্যাতনের ভয় উপেক্ষা করে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ধারাবাহিকভাবেই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াত-শিবির নিষ্ক্রিয় থাকলে বিএনপির পক্ষে কোনো আন্দোলন করা যে সম্ভব নয় এটা এখন সবার কাছেই স্পষ্ট। তাছাড়া সভা-সমাবেশ বা আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে অর্থের প্রয়োজন তার সিংহভাগের জোগান দিচ্ছে জামায়াত।

আগামী নির্বাচনেও জামায়াতের সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতার উপরই বিএনপিকে নির্ভর করতে হবে বেশি। এই বাস্তব অবস্থায় নির্বাচনে জয়লাভের পর জামায়াতের পছন্দ বা ইচ্ছার বাইরে যাওয়া বিএনপির পক্ষে সম্ভব হবে নয়। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে জামায়াতকে তুষ্ট করার নীতি নিলে এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারকাজ বন্ধ রাখলে কিংবা দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের শাস্তি মওকুফের উদ্যোগ নিলে দেশের মানুষের মধ্যে খারাপ প্রতিক্রিয়া হবে। নতুন প্রজন্ম এটা ভালোভাবে নেবে না।

এখন বিএনপি নেতারা বলছেন তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে নন। তারা বিচার প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের চান। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা যদি বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন তাহলে মানুষের কাছে তাদের চালাকিটা ধরা পড়বে এবং রাজনৈতিকভাবে তাদের আবার জনবিচ্ছিন্নতার শিকার হওয়ার আশংকা দেখা দেবে।

সেজন্য বিএনপি এখন নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আওয়ামী লীগকে একটি একতরফা নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিতে চায়। এতে ভবিষ্যতে তাদের পক্ষে আওয়ামী লীগ ‘বধ’ করা সহজ হবে। বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠবে এটা সবাই বোঝেন।

সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আওয়ামী লীগ যদি যেনতেনভাবে একটি নির্বাচন সম্পন্ন করে তাহলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে তা তাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করায় এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জনমত নিজেদের খুব একটা অনুকূলে নিতে পারেনি বিএনপি।

কিন্তু আগামী নির্বাচনের পর একটি বিতর্কিত সরকার ক্ষমতায় বসলে সেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা কঠিন কাজ হবে না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে তাতে ওই সরকারের পক্ষে মেয়াদ পূর্ণ করাও অসম্ভব হতে পারে। ওই সরকার তাদের স্বল্পমেয়াদে যদি যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রমটি শেষ করতে পারে তাহলে এই ইস্যু নিয়ে বিএনপির উপর কোনো চাপ থাকবে না। বিএনপির এই ভাবনার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বিএনপি হয়তো কোনোভাবেই নির্বাচনে আসবে না।

আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে চাপের মধ্যে ফেলতে না পারলেও, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগকে যথেষ্ট বেকায়দায় ফেলতে সক্ষম হতে চলেছে বিএনপি। ১৮ দলীয় জোটে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা সফল হয়নি। মন্ত্রিত্বের টোপ দিয়েও কর্ণেল (অব) অলি আহমেদ এবং আন্দালিব পার্থকে ১৮ দল থেকে বের করা যায়নি। ড. কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকী এবং মাহমুদুর রহমান মান্নাদেরও পক্ষে টানতে পারেনি আওয়ামী লীগ। বিএনপিকে ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলো যে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছে না এটা বিএনপির একটি বড় নৈতিক সাফল্য।

আওয়ামী লীগের একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবিও সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে যে বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে সেই নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করবে না। নির্বাচনী রাজনীতিতে সিপিবি বড় ফ্যাক্টর না হলেও তাদের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে।

প্রগতিশীল, অসম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ধারার একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল হিসেবে সিপিবির এই সিদ্ধান্ত বিএনপিকে উৎসাহিত করবে। ১৯৮৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সিপিবির কয়েকজন প্রার্থী সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাই সিপিবির আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না চাওয়া আওয়ামী লীগের জন্য কিছুটা বিব্রতকর।

এটাকে কেউ কেউ বিএনপির এক ধরনের সাফল্য বলেও মনে করছেন। বিএনপি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে বন্ধুহীন করতে পেরেছে এটা তার একটি প্রমাণ। তবে সিপিবির এই সিদ্ধান্ত দেশের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য কতটা সহায়ক হবে সে প্রশ্নও অনেকের মনেই দেখা দিচ্ছে।

জামায়াতের ফাঁদে পা দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না। এটা সুস্থধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতি অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে একটি পরিকল্পিত অন্তরায় সৃষ্টির কৌশল। এই ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়ে সিপিবি পরোক্ষভাবে জামায়াতের উপকার করছে কিনা সে প্রশ্ন কেউ করতেই পারেন।

আওয়ামী লীগ এখন একটি কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে দলটি তার সংগঠন শক্তি দুর্বল করে ফেলেছে। দলের জনবিচ্ছিন্নতা বেড়েছে। সারা দেশে আওয়ামী লীগ কোন্দলে জর্জরিত হওয়ায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়েছে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় জামায়াত-শিবির মাঠ দখলে রাখার সুযোগ পাচ্ছে।

অথচ আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে কেবল আওয়ামী লীগ যে সংকটে পড়বে তা নয়। দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের চেতনার রাজনীতিই বিপদের মুখে পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। সেজন্য আওয়ামী লীগকে গণতান্ত্রিক-সাংবিধানিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে এবং একইসঙ্গে নির্বাচনটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ করতে প্রত্যেক আসনে বিভিন্ন দল-মতের একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণ যাতে থাকে সেটাও দেখতে হবে।

তা না হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং একতরফা নির্বাচনের বদনাম আওয়ামী লীগের কপালে এঁটে থাকবে। দলটি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে দেশের রাজনীতি কোন ঘাটে গিয়ে নোঙর ফেলবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.