ট্রাকভর্তি অস্ত্র রেখে গুম হলেন আওয়ামীলীগ নেতা পিন্টু

২৬ জুন দিবাগত রাত। বগুড়ার কাহালু থানার বীরকেদার ইউনিয়নের জোগার পাড়া গ্রাম। সেখানে নাগর নদীর কোল ঘেষাঁ খলিলের ইটভাটায় মালবোঝাই ট্রাক এসে থামলো। ট্রাকের ওপর আনারস। ইটভাটায় আনারসের ট্রাক দেখে সন্দেহ করলেন অনেকেই। এরপর রাত দু’টায় শুরু হলো সেই ট্রাক থেকে অস্ত্র খালাস। জোগার পাড়া গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে নদীর ধারে এলেন। দেখলেন ট্রাক থেকে বস্তা বোঝাই কী যেন নামিয়ে গ্রামের ভেতর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলো করলেন তাদের। দেখলেন বস্তাগুলো রাখা হচ্ছে কাহালু উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি আখলাকুর রহমান পিন্টুর বাড়িতে। তিনি আবার ছুটে আসলেন ট্রাকের কাছে। তাকে সেখানে ভিড়তে দেয়া হলো না । তিনি জোর করলেন। অস্ত্র খালাসীরা বাধা দিল। বুদ্ধি খেটে ডেকে নিলেন তারই বন্ধু আলতাফকে। তাদের সন্দেহ ঘনীভুত হওয়ায় রাতেই দৌড়ে গেলেন নিকটবর্তী দুপচাঁচিয়া থানায় । রাতের আঁধারে ট্রাক থেকে রহস্যজনক মাল খালাসের খবর দিলেন। ওসির নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থল আসতেই খালাসীরা পালালেন। পুলিশ দেখলো ট্রাক ভর্তি অস্ত্র আর গোলাবারুদ। তখন দুপচাঁচিয়া থানার ওসি খবর দিলেন কাহালু থানায়। এরপর দুই থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে পিন্টুর বাড়ি থেকে উদ্ধার করলেন বস্তা বস্তা বিস্ফোরক আর চাইনিজ রাইফেলের গুলি। সকাল হতেই সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হলে। ঐ গ্রামের আশপাশের ডোবা নালা পুকুর থেকে উদ্ধার হলো এক লাখ চায়নিজ রাইফেলের গুলি। যেখানেসেখানে পড়ে থাকাবস্তা বস্তা বিস্ফোরক। নদঅতে পাওয়া গেল অনেক অস্ত্র। কিন্তু পাওয়া গেলোনা আওয়ামী লীগ নেতা আফলাঞুর রহমান পিন্টুকে। সেই থেকে তিনি আজও গুম। দশ বছর চলে গোলো সেই অস্ত্র খালাসের কোন কিনারাও হলোনা।
দেশ তোলপাড় করা ট্রাকভর্তি অস্ত্র,গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার ঘটনার ১০ বছর পূর্ন হলো আজ। চাঞ্চল্যকর এ মামলার প্রধান আসামী আওয়ামী লীগ নেতা আফলাকুর রহমান পিন্টুর খোঁজ মিলেনি আজো। ঘটনার রাত থেকে দশ বছর ধরে তিনি গুম হয়ে আছেন। দীর্ঘদিন স্থগিত থাকার পর হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটি আবারও সচল হয়েছে। বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৩ এ এই মামলার বিচারিক কার্য্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে এ মামলায় একজনের আংশিক স্যাগ্রহণও করা হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই অস্ত্র খালাস নিয়ে সে সময় সারাদেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। এখনকার মহামান্য রাষ্ট্রপতি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংসদীয় টীম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছিলেন,যারাই এই অস্ত্র খালাসের সঙ্গে জড়িত থাকনা কেন তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দেয়া হবে। সেই থেকে দশ বছর পার হয়েছে। পরিদর্শন দলের নেতা আজকে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, কিন্তু সেই একট্রাক অস্ত্র খালাসের ঘটনা আজও রহস্যই রয়ে গেছে।
২০০৩ সালের ২৭ জুন রাতে বগুড়ার কাহালু উপজেলার যোগারপাড়া নামক স্থানে একটি ইটভাটায় ট্রাক ভর্তি অস্ত্র ও বিস্ফোরক খালাসের সময় স্থানীয় ২ জন কৃষক টের পেয়ে গ্রামবাসিকে জানালে তারা বিষয়টি কাহালু ও দুপচাঁচিয়া থানার পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ সেখানকার ইয়াছিনের ইট ভাটা ও যোগারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা কৃষকলীগের তৎকালীন সভাপতি সৈয়দ আফলাকুর রহমান পিন্টুর বাড়ী থেকে প্রায় এক লাখ রাউন্ড চাইনিজ রাইফেলের গুলি ও ৮৪ কেজি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক উদ্ধার করে। পরে সেখানে নাগর নদীর ভেতর থেকে আরো অস্ত্রও উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্যাদি ও অস্ত্র আইনে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করা হয়।
থানা ও ডিবি পুলিশ হয়ে মামলাটি সিআইডি পুলিশ তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডি পুলিশের তৎকালীন সহকারি পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান। এই চার মামলায় উপজেলা কৃষকলীগের তৎকালীন সভাপতি স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ আফলাকুর রহমান পিন্টু, তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম বিথীসহ আলতু মিয়া, আশিষ দেব বর্মা, যুবলীগ নেতা আতিকুর রহমান দুলু ও হারুন অর রশিদ জালালকে অভিযুক্ত করা হয়।
ঘটনার রাতেই গা ঢাকা দেন কৃষকলীগ সভাপতি পিন্টু । অস্ত্র খালাসে তাকে প্রধান হোতা মনে করা হলেও গত ১০ বছরেও তার সন্ধান পায়নি পুলিশ। তিনি জীবিত না মৃত তা জানা যায়নি। ভারতে দেখা গেছে বলে কেউ কেউ তথ্য দিলেও তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
এবিষয়ে রাষ্ট্রপরে কৌসুলী (পিপি) অ্যাডভোকেট হেলালুর রহমান বলেন, মামলাটি বর্তমানে স্যা পর্যায়ে রয়েছে। সাীর জন্য আদালত দিন ধার্য্য করেছেন। মামলাটি এর আগে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে ছিল। অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে দু‘টি এবং বিস্ফোরক আইনে একটিসহ মোট তিনটি মামলার স্যাগ্রহণের দিন ধার্য্য ছিলো। ওই তিনটি মামলায় বাদিসহ তিনজনকে আদালতে হাজির হতে বলা হলেও শুধু মোজাম মন্ডল নামের এক সাী আদালতে হাজির হন। তিনি অস্ত্র আইনের একটি মামলায় জব্দ তালিকার স্যা প্রদান করেছেন।
এদিকে, চাঞ্চল্যকর ও রাস্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন এ মামলাটি দীর্ঘ দিনেও নিষ্পত্তি না হওয়ায় জনমনে নানান প্রশ্নের সুষ্টি হয়েছে। কারা কি কারনে এত বিপুল পরিমান আগ্নেয়াস্ত্র গুলি ও বিস্ফোরক দেশের অভ্যন্তরে এনেছিল এবং এর উৎসই বা কোথায়,তা খুঁজে বের করা দেশের জন্যই জরুরি বলে সচেতন মহল মনে করেন।
বিশেষ করে চট্রগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলাটি নিয়ে যখন সরকারবিরোধী রাজনীতিকদের নাজেহাল করা হচ্ছে তখন এত বড় একটা অস্ত্রেরর চালান আটকের পরেও মামলাটি নিয়ে সরকারের অনীহার কারনে অসংখ্য প্রশ্নের ডালপালা মেলছে। তমাসিন দলের নেতারা জড়িত থাকার কারনেই মামলাটি নিয়ে গড়িমসি হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখার দাবি বগুড়ার সাধারন মানুষের।