জঙ্গিবাদের একাল সেকাল

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগড়িষ্ঠতা না পেলেও জামায়াতে ইসলামের সমর্থনে সরকার গঠন করে তারা। তখন জামায়াত, সরকারে যোগদান না করলেও নেপথ্যে সরকারের অঘোষিত চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে । আর বিএনপিকে সমর্থন দানের বিনিময়ে পরোক্ষভাবে তাদেরকে চাপে রেখে জামায়াত নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে থাকে। সেই সময়েই জামায়াতে ইসলাম ও ইসলামী ঐক্যজোটের সহযোগীতায় আফগান ফেরৎ যোদ্ধারা তাদের নিরাপদ চারণভুমি ও ট্রানজিট হিসাবে বেছে নেয় বাংলাদেশকে। আইএসআই, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের বেশ কয়েকটি দেশ এদেশের জঙ্গীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। এদের সাথে যুক্ত হয় ভারত ভিত্তিক ইন্ডিয়ান মুজাহিদীন, আইএম ও উলফা এবং পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন জয় ই মোহাম্মদ, আল কায়দা, এবং লস্করই তৈয়বা প্রভৃতি জঙ্গী সংগঠন। তখন তারা কোন এ্যকশনে না গেলেও নামে বেনামে বিভিন্ন জঙ্গী গ্রুপ তৈরী করে অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে অনেকটাই এগিয়ে যায়।
কিন্তু ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ একুশ বছর পর শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সেই জঙ্গীরা এ্যাকশান শুরু করে এবং তারই অংশ হিসাবে যশোহরে উদীচির অনুষ্ঠানে বোমা হামলার করে দশজন সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা, শতাধিত লোককে আহত করে জঙ্গীরা। তারপর রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে টাইম বোমা আক্রমন চালিয়ে হত্যা করে দশজনকে। ফরিদপুরের নানিয়ার চর গীর্জাও হামলার শিকারে পরিনত হয় জঙ্গীদের। কোটালী পাড়ায় হরকাতুল জেহাদ নেতা মুফতি হান্নান, প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার জন সমাবেশ স্থলে প্রায় পঞ্চাশ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু অলৌকিকভাবে শেখ হাসিনা সে যাত্রায় বেঁচে যান। এ হামলা প্রচেষ্টার মাধ্যমে হরকাতুল জেহাদ নামের জঙ্গীবাদী দলটির চেহারা উন্মোচিত হয় দেশের মানুষের কাছে।
সেই সময় শেখ হাসিনার আমন্ত্রনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঢাকা সফরের সময় আমেরিকার গোয়েন্দারা সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতি সৌধে ক্লিনটনের শ্রদ্ধা জানানোর বিরোধিতা করে রিপোর্ট দেয় যে, ক্লিনটন স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে ওসামা বিন লাদেন এর তালেবান জঙ্গীরা তার ওপর আক্রমন চালাতে পারে। এ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই ক্লিনটনের জাতীয় স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। এরপর আওয়ামী লীগ শাসনের একেবারে শেষ সময়ে চাষারায় নারায়নগজ্ঞ আওয়ামী লীগের অফিসে নৃশংস বোমা হামলা চালিয়ে একুশজন নেতা কর্মীকে হত্যা করে তারা।
২০০১ এক সালে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ফলাফল জালিয়াতির নির্বচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এবার আর জামায়াত বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে থেকে সমর্থন না জানিয়ে সরারসরি ক্ষমতার অংশীদার হয় । এই সময় দরকষাকষি করে সমাজ কল্যাণ, কৃষি মন্ত্রনালয় পরে শিল্প মন্ত্রনালয় এর মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি পোর্টফোলিও বাগিয়ে নেয় জামায়াত। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী প্রথমে কৃষি এবং পরে শিল্প মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন, এবং মহাসচিব আলী আহসান মুজাহিদ সমাজ কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে বাঁধাহীন ভাবে জঙ্গী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। আলী আহসান মুজাহিদ তখন তাদের অনুসারী কয়েক হাজার এনজিওকে নিবন্ধন দিয়ে এনজিও ব্যুরোর মাধ্যমে টাকা পয়সা ছাড় করিয়ে তাদের কর্মী বাহিনীকে গায়ে গতরে হৃষ্টপুষ্ট করে তোলেন। আর মতিউর রহমান নিজামী তার মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন জেটিতে দশট্রাক অস্ত্র খালাস করিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ব বৃহৎ অস্ত্র চোরাচালানের কাজটি করেন। সেই সময়ই বগুড়াতে কয়েক লক্ষ গুলি, অস্ত্রশস্র ধরা পরে। কিন্তু অদৃশ্য এক সুতার টানে এত বড় দুইটি অস্ত্র চোরাচালান মামলা ধামাচাপা পড়ে যায়।
খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধান মন্ত্রীত্বকালে আরো বেপড়োয়া হয়ে ওঠে জঙ্গীরা। এই সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গীদের জন্য হয়ে ওঠে স্বর্ণযুগ। বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠনের আড়ালে বেড়ে ওঠা জঙ্গীরা। খালেদা জিয়ারর এই মেয়াদে জঙ্গীরা বার বার আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার টার্গেট করে। তখন হরকাত-উল জিহাদ হুজির প্রধান মুফতি হান্নানের মার্সি পিটিশনে সুপারিশ করে তার মুক্তির সুপারিশ করেছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের মন্ত্রী, এমপি ও নেতারা।