বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান নিয়ে দেশ বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা বিশেষ করে বিশ্বের প্রভাবশালী পত্রিকা গার্ডিয়ান ও দি টাইমস এ নিয়ে বেশ কিছু রিপোর্ট করে। ২০০২ সালের ১৫ অক্টোবর দি টাইমস ম্যাগাজিনে এলেক্স পেরির এক এক্সক্লুসিভ নিবন্ধে বলা হয়, এমভি মক্কা নামক একটি জাহাজে চড়ে ১৫০ জন আফগান ফেরত সশস্ত্র যোদ্ধা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেই যোদ্ধারাই দেশের মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গী তৈরীতে লিপ্ত হয়। এ জঙ্গীদের সহযোগিতায়ই তৎকালীন সরকার বেছে বেছে আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীল নেতাদের খুন করার মিশনে নেমে পড়ে। এ খুনের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শেখ হাসিনা সরকারের সফল অর্থমন্ত্রী- এসএসএস কিবরিয়া, বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা- আহসান উল্লাহ মাস্টার, মমতাজ উদ্দিন, খুলনার- মনজুরুল হক এডভোকেট, সাংবাদিক শামসুর রহমান, বালু প্রমুখ। তারপর থেকে সিনেমা হল, মাজার, উপাসনালয়ে বোমা হামলা করে নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে থাকে। ২০০৪ সালের একুশে আগষ্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনার সন্ত্রাস বিরোধী জনসভায় এক জঘন্য কাপুরুষোচিত গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী সমর্থককে হত্যা করে এবং এ হামলায় প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করে। সেই নৃসংশতম গ্রেনেড হামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ধামাচাপা দেয়ার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার জজ মিয়া নাটকের অবতারনা করে।
কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ প্রবাদের মতো ২০০৭ সালে জরুরী শাসনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলাটি পুনরজ্জীবিত করে এবং এ নৃসংশতম হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু ও তার ভাই সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে জেলে ঢুকায়। যার প্রধান আসামী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। একটা সময়ে এসে বিএনপি-জামায়াত জোটের সৃষ্ট জঙ্গীরা তাদের জন্যই ফ্রাঙ্কেষ্টাইন হিসাবে আবির্ভুত হয়। ২০০৪ সালের ২১শে মে বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী বাংলাদেশের নিজের মাতৃভুমি সিলেটে, শাহজালাল(র) মাজার জিয়ারত করতে এসে জঙ্গীদের বোমাহামলার শিকার হন। তিনি ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই বোমা হামলায় তিন চারজন সাধারণ মানুষ নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়।
বিএনপির এই শাসনামলে জঙ্গীরা সবচে বড় মহড়াটি দেয় ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট বাংলাদেশের তেষট্টি জেলার ৫২৭ স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে। এই বোমা হামলায় ২৫০টির মত মামলায় গ্রেফতারকৃত অধিকাংশ আসামী পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদেরকে কোনো না কোনো ভাবে জামায়াত রাজনীতিতে সম্পৃক্ত বলে বলেছে। এ বোমা হামলার মাধ্যমে তারা তাদের শক্তি ও সামর্থ জানান দিয়ে দেশের ভেতর একটা আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বিএনপি সরকারকে বাগে রাখার চেষ্টা করে। এই সময়ে জঙ্গীরা বিএনপি-জামায়াতের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে বিশেষ করে জামায়াতে ইসলাম, আজিজূল হক ও ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য তত্বাবধানে আফগান ফেরত যোদ্ধাদের দিয়েই বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের প্রসার ঘটানো হয়।
বিএনপির ওই মেয়াদে বাংলাভাই নামক ফ্রাঙ্কেষ্টাইন সৃষ্টি করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সর্বহারা নিধনের নামে প্রগতিশীলদলের নেতাকর্মীদের ধরে ধরে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তখন দেশব্যাপী এ নৃশংস কর্মকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ শুরু হলে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী বলেছিলেন দেশে বাংলা ভাইয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই; তার সাথে কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুর রহমান বাবর (বাঙ্গরেজী নামে খ্যাত) ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন দেশে বাংলা ভাই বা ইংরেজী ভাই বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই, স্বয়ং খালেদা জিয়া বলেছিলেন দেশের ভাবমুর্তি ধ্বংস করার জন্য আওয়ামী বাকশালীরা এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ শায়খ রহমান, বাংলা ভাইসহ যাদের ফাঁসি হয়েছে এদের সবাই এক সময় জামায়াতের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে এ সব জঙ্গী সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম বিস্তার করে জঙ্গীবাদী কার্যক্রমকে আরো বেগবান করা হয়েছে বলে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী জরীপে বেরিয়ে আসে।