রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, জঙ্গি তৎপরতা এবং বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক একটি পরিস্থিতি

বাংলাদেশে আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে জঙ্গি তৎপরতা। দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন অংশকে আশ্রয়স্থল হিসেবে বানিয়ে দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা নিজেদের প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বেশ জোরেসোরে। কিছুদিন আগে গোপন বৈঠকের সময় একইসাথে ১৬ জন জঙ্গি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় গুরুত্বপূর্ণ এবং আঁতকে উঠার মতো কিছু তথ্য বেরিয়ে আসে, আর তার ফলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। মায়ানমারের অস্থিতিশীলতার সুযোগে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিয়ে জঙ্গি সংগঠনগুলো আবারও নাশকতামূলক কর্মকান্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, “জামায়াত-এ-আরাকান” নামক একটি জঙ্গি সংগঠন কক্সবাজারে বেশ সক্রিয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গিদের সাথে মিলিত হয়ে তারা পার্বত্য অঞ্চল এর কিছু অংশ এবং মায়ানমারের আরাকান এই নিয়ে একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে বলে জানা যায়। বান্দরবন এবং কক্সবাজারের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রভাব কম, এরই সুযোগে বিভিন্ন অংশে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে দুর্ধর্ষ জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যরা।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা আছে, এই অভিযোগ অনেক আন্তর্জাতিক মাধ্যমের। কিন্তু এই বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সেরকম পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমান না থাকায় প্রথম থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে দেশের সরকার। কিন্তু বর্তমানে একইসাথে বেশ কিছু জঙ্গিসদস্য এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ, জিহাদী সরঞ্জাম পুলিশের হাতে আসায় এই অভিযোগের দিকে নতুন করে দৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়েছে বলে মনে হয়। শুধু জঙ্গিসদস্যই নয়, বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিসংগঠনগুলোর বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় সদস্যকেও। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দুর্গম অঞ্চলগুলোর আড়ালে আন্তর্জাতিক জঙ্গিসংগঠনগুলো ঠিক কি ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা চালাচ্ছে এই প্রশ্ন আবার সামনে চলে এলো।
মায়ানমারে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীর অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পায়। বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ এবং পুলিশের সহযোগিতায় সরকার অনেক শরণার্থীকে ফেরাতে সক্ষম হলেও অনেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশে গোপনে প্রবেশ করে। এছাড়াও জামাত সমর্থিত বেশ কিছু এনজিও এর প্রতক্ষ্য সহায়তায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের দেশের অভ্যন্তরে আসার সুযোগ করে দিতে দেখা যায়। বর্তমানে শরনার্থী আগমন হ্রাস পেলেও গোপনে অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছেনা। রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চল দিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে অনেকেই। পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন সময়ে আগত রোহিঙ্গা শরনার্থীরা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী, এই অভিযোগ অনেক আগে থেকেই ছিলো। দেশের ভেতরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী চক্রের সাথে মিলিত হয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীরা অনেকদিন ধরেই সমাজ বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত। এছাড়াও যুদ্ধাপরাধীদের দল জামাতের প্রতক্ষ্য সহযোগিতায় অনেক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী আইনের ফাঁক গলে বাংলাদেশী পাসপোর্ট পেতে সক্ষম হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমিক হিসেবে চলে যায়। এদের অনেকেই সেসব দেশে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং পারতপক্ষে এই দোষ যায় বাংলাদেশী শ্রমিক জনগোষ্ঠির উপরে। একারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো দেশে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি হুমকির মুখে পড়ে। তারপরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মদদে দেশে রোহিঙ্গা অবৈধ অনুপ্রবেশ জারি আছে এবং এসব অনুপ্রবেশকারীকে নানাবিধ অসামাজিক কার্যকলাপে ব্যবহার করারও যথেষ্ঠ প্রমান রয়েছে। তাই এবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। কিন্তু তারপরেও বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা তৈরী করে কিছু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী এই অনুপ্রবেশকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে এবং রাখাইন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তৎপরতায় মদদ দেয়ার আশ্বাস দিতে থাকে।
বর্তমানে বেশ কিছুদিন ধরে পুলিশ এবং রেব এর অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, দেশে আবারও সংঘটিত হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদ। তারা বান্দরবন জেলাতে “জামায়াত-এ-আরাকান” নামে সংগঠিত হচ্ছে এবং দল ভারী করছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের দিয়ে। এই দলের ৪ জন সদস্য সম্প্রতি গ্রেফতার হয় কক্সবাজার পুলিশের হাতে। তাদের তথ্যমতে দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে তারা কার্যকলাপ চালিয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, একই সাথে তারা বান্দরবন ও কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের কিছু রোহিঙ্গাদেরকে সশস্ত্র ট্রেনিং দিয়ে আফগান যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত করছিল। তারা কক্সবাজারে রিক্সা ও টমটম গাড়ি চালিয়ে ছদ্দবেশে অবস্থান করছিল। এধরনের কার্যকলাপ নতুন কিছু নয়। এরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কক্সবাজারে এসে বিভিন্ন পরিচয়ে অবস্থান করার পর বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে। মৌলবাদী চক্রগুলো এবং মিয়ানমার বিদ্রোহী সংগঠন আরএসও, আরএনও, নুপা সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা এদেরকে পৃষ্টপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে বলে জানা যায়।
একইসাথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকরী বাহিনী এই দলগুলোর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। দেশের অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপারে সরকারের উচ্চমহল প্রথম থেকেই ছিলো উদাসীন। কিন্তু বর্তমানে এই পরিস্থিতি একটি উদ্বেগজনক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উদাসীনতার সুযোগে দেশে আশ্রয় নিচ্ছে নানা জঙ্গি সংগঠনের দুর্ধর্ষ সদস্যরা। পুলিশের কিছু অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে এই তথ্যের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। দেশে অনেকদিন ধরেই ভারত ও পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় কর্মীরা অবস্থান করে এসেছে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত মনিটরিং এর ব্যবস্থা কখনো নেয়া হয়নি। এরই সুযোগে এরা দেশের ভেতরে সংগঠিত হয়েছে।২০০৯ সালের ২৭ মে, ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড আব্দুর রউফ দাউদ মার্চেন্ট সর্বপ্রথম বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক অপরাধী ও জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যকলাপের ব্যাপারে তথ্য জানায়। তারপরে দেশে গ্রেফতার হয় পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন “লস্কর-ই-তৈয়বার” শীর্ষ নেতা মুফতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ। তার তথ্যনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ বছর ধরে ৫টি কওমি মাদ্রাসায় জঙ্গি প্রশিক্ষণের বিবরণ জানা যায়। সে নিজেই প্রায় ৫ হাজার জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে স্বীকার করে। তার সঙ্গে দেশের শীর্ষ সকল জঙ্গির সম্পর্ক ছিলো এবং ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার প্রধান আসামিদের সাথেও তার যোগাযোগ ছিলো বলে সে স্বীকার করে।
মুফতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ এর তথ্য অনুযায়ী পরবর্তিতে ঐ বছর গ্রেফতার করা হয় “লস্কর-ই-তৈয়বার” অন্যতম সংঘটক, ২৫ বার আফগান যুদ্ধে অংশ নেয়া, সমরাস্ত্র ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ মাওলানা মো: মনসুর আলীকে। সে ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলো। ২০১০ সালে রেবের গোয়ান্দা শাখা রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানভিত্তিক আত্মঘাতী জঙ্গি সংগঠন “জইশ-ই মোহাম্মদের” উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দুর্ধর্ষ জঙ্গি রেজওয়ান আহম্মদকে। পরে তার বাংলাদেশী সহযোগীদেরও আটক করা হয়। একইসাথে গ্রেফতার হয় তাদের আশ্রয়দাতা জামাত নেতা। তাদের তথ্যানুযায়ী ঢাকার নিউমার্কেট অঞ্চলে বিভিন্ন ব্যবসার আড়ালে জঙ্গিরা নিজেদের অবস্থান তৈরী করে নিচ্ছে। দেশে নানা সময়ে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা আটক হলেও দেশের অভ্যন্তরে এধরনের অবৈধ অভিবাসী সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের কাছে। তাই দেশের বিভিন্ন আন্দোলন ও সহিংসতায় এধরনের জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং অবদান সম্পর্কে সঠিকভাবে নিঃশ্চিত হতে পারছেনা সরকার।
গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর ফকিরারপুল এলাকাতে গ্রেফতার হয় পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনের বাংলাদেশ প্রধান মাওলানা ইউসুফ। তার থেকে জানা যায়, কক্সবাজার, বান্দরবন এলাকায় অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদেরকে টার্গেট করে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই মোহাম্মদ বাংলাদেশে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এর আগেও দেশে নানা জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের ছিলো আস্তানা। এমনকি বাংলাদেশে পড়াশোনা করে নিজ দেশে হামলার পরিকল্পনা করে ভারতের কাশ্মিরের নাগরিক ওয়াসিম আহম্মেদ। মুম্বাইয়ের হাইকোর্টে বোমা হামলার পরিকল্পনায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে তাকে আটক করে মুম্বাই পুলিশ। সে সিলেটের রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিল।
দেশের অভ্যন্তরে এভাবে সন্ত্রাসবাদী আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যকলাপের ব্যাপক বিস্তার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। পার্বত্য অঞ্চল হতে আটককৃত জঙ্গিদের থেকে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক তথ্য আঁতকে উঠার মতো একটি খবর। বান্দরবন এর দুর্গম জঙ্গলে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করে তাতে উন্নত অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে অনেক জঙ্গি। এদের সংখ্যা অনির্দিষ্ট। এভাবে আবার দেশের ভেতরে নাশকতামূলক কর্মকান্ডের জন্য সংগঠিত হচ্ছে সন্ত্রাসীরা। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদলগুলোর মদদে পার্বত্য অঞ্চলগুলোকে অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহার করে এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের দলে নিয়ে জঙ্গি তৎপরতার উত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি হুমকি।
এই তৎপরতাকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ব্যবহার করছে মৌলবাদী চক্রগুলো। দেশে নানা রকমের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে এরা নিজেদের ফায়দা লোটার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আর দেশের প্রথম সারির অনেক দৈনিক এবং সংবাদ মাধ্যম নানা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে তাদের খবরের পাতা গরম রাখলেও দেশের আইন-শৃঙ্খলার এহেন অবনতির খবরে নিরব ভূমিকা পালন করছে। তাই আমাদের সাধারণ নাগরিকদেরই দেশের স্বার্থে সচেতন ও সংঘবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। নয়তো আবার দেখতে হবে অজস্র বোমা হামলা, হামলায় নিহত স্বজনের মৃতদেহ এবং আবার হয়তো রমনার বটমূলের মতো আরেকটি হৃদয় বিদারক সন্ত্রাসী হামলার জন্ম হবে।