গৃহযুদ্ধ, আন্তঃরাষ্ট্রিক যুদ্ধ না স্বাধীনতার যুদ্ধ?

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (আজকের বাংলাদেশে) পাকিস্তানি মিলিটারী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার ব্যপারে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-পন্থীদের দুইটি এপোলোজি চালু আছে:
ক. ১৯৭১ সালের মার্চ নাগাদ শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে একটি সমান্তরাল সরকার (parallel government) বা দস্যু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলো। এমতাবস্থায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের অথোরিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তানি মিলিটারী একটি ক্র্যাকডাউন করতে বাধ্য হয়। কূটচরিত্র বাঙালিদের সাথে সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরেই নিরুপায় হয়ে জেনারেল ইয়াহইয়া খান ক্র্যাকডাউনের আদেশ দিতে বাধ্য হোন। অতএব, ১৯৭১-এ যা হয়েছে তার মূল দায় বাঙালিদের।
খ. ১৯৭১-এ যা হয়েছে তা মূলত ভারতের ষড়যন্ত্র। পাকিস্তান ভাঙার এই ষড়যন্ত্রটি বাস্তবায়নের জন্যেই মুক্তিযোদ্ধা নামধারী দুস্কৃতিকারীরা ভারতে ট্রেনিং নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে হামলা করেছে এবং পাকিস্তানি মিলিটারী ও তাদের পূর্ব পাকিস্তানি সহযোগীরা (পড়ুন: জামায়েত-ই-ইসলামী ও ইসলামপন্থী দলগুলি) সেই হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে মাত্র।
এপোলোজি ক অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে একটি গৃহযুদ্ধ (যেমন নেপালের গৃহযুদ্ধ) হয়েছিলো পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের অথোরিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। আবার, এপোলোজি খ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে একটি আন্তঃরাষ্ট্রিক যুদ্ধ (যেমন ইরাক-ইরান যুদ্ধ) হয়েছিলো ভারতের ষড়যন্ত্রে।
আপাতঃদৃষ্টিতে বিপরীতমুখী মনে হলেও এই দুই এপোলোজির উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি মিলিটারী যে একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা (genocide) চালিয়েছিলো, সেই ঐতিহাসিক সত্যটি আড়াল করা/চেপে যাওয়া। এহেন চালাকি কিন্তু genocide denial এর অনেক পুরোনো ট্রিক, এবং পাকিস্তান ও পাকিস্তান-পন্থীরা অনেক আগে থেকেই এগুলি বলে আসছে। আমি গত কয়েকদিনে বেশ অবাক হয়েই দেখলাম যে কতিপয় বাংলাদেশী তরুণ আমার সাথে এই ট্রিকবাজিটি করার চেষ্টা করেছেনএবং অনেক পাঠককে বিভ্রান্তও করেছেন।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্টা যে ১৯৭১ সালের ১৬’ই ডিসেম্বর তা নিয়ে আমি যে নোটটি লিখেছিলাম সেটিকে চ্যালেঞ্জের নামেই এই কুকর্মটি তারা করছেন (ঐ নোটে আমি দলিলসহ যে যুক্তিগুলি উপস্থাপন করেছি তা কিন্তু এখনও কেউ খণ্ডন করতে পারেননি)।
যারা বলছেন ১৯৭১-এ আন্তঃরাষ্ট্রিক যুদ্ধ হয়েছিলো তারা আসলে কাকে বাঁচাচ্ছেন?
কিছু প্রশ্ন তুললেই কিন্তু তা পরিষ্কার হয়ে যায়।
১৯৭১ এর জেনোসাইড কি স্টেট ক্রাইম ছিলো নাকি অন্য কিছু ছিলো? পাকিস্তানি মিলিটারী কি নিজ রাষ্ট্রের নাগরিকদের সুপরিকল্পিতভাবে (গণহত্যার পরিকল্পনাটি কিন্তু ১৯৭১-এর অনেক আগেই হয়েছিলো) হত্যা করেছিলো নাকি ভারতীয় প্রক্সি যুদ্ধের জবাব দিয়েছিলো মাত্র? অপারেশন সার্চলাইট কি সুপরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা ছিলো নাকি সমান্তরাল সরকার দমনের অভিযান ছিলো?
কেউ যদি এই প্রশ্নগুলি নিয়ে আমার সাথে আলাপ করতে চান বা বিতর্ক করতে চান আমি অবশ্যই আলাপ করবো। কিন্তু অসংলগ্ন কুযুক্তি আর অসংযত, অশালীন ভাষা ব্যবহার করে কোনও কুতর্কে আমার আগ্রহ নেই।
গৃহই যেখানে ভেঙ্গে যায়, সেটি গৃহযুদ্ধ নয়। ঔপনিবেশিক জুলুমবাজি আর গণহত্যার বিরুদ্ধে মানুষ যখন অস্ত্র হাতে বিদ্রোহ করে সেটি আন্তঃরাষ্ট্রিক যুদ্ধ নয়। ১৯৭১-এর যুদ্ধটি তাহলে কি?
এই প্রশ্নটির উত্তর আমরা পাই বাংলাদেশের সংবিধানের আর্লি ভার্শনটিতে: “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।” “জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের” কথাটির জায়গায় পরে “জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের” কথাটি বসানো হয়।
১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরে যে যুদ্ধটি হয়েছিলো সেটি গৃহযুদ্ধ ছিলোনা, আন্তঃরাষ্ট্রিক যুদ্ধও ছিলোনা — “জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ” ছিলো, স্বাধীনতার জন্য একটি ন্যায়যুদ্ধ ছিলো।